Main Menu

ঈদুল আযহার শিক্ষা, সাঈদ আল আমিন

ঈদ (عيد) একটি আরবি শব্দ। শব্দটি খুশি, উৎসব এবং আনন্দ প্রকাশক অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শব্দটি আরবি হলেও বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি এবং হিন্দিসহ প্রায় সব ভাষাতেই শব্দ ও অর্থের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে ১২ই জিলহজ্ব দুপুর পর্যন্ত মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে প্রাণী জবাই করাকে ঈদুল আযহা বলা হয়।

পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের তথ্য অনুসারে পবিত্র ঈদুল আজহার সাথে জড়িয়ে রয়েছে নিগূঢ় ইতিহাস যার সূচনা হয়েছিল হযরত আদম আঃ পুত্র হাবিল ও কাবিলের প্রতিযোগিতা মূলক কুরবানি করার মাধ্যমে।

একজন সফল হলেন আত্মিক পবিত্রতা উপর ভর করে আর অন্যজন পথহারা হলো লোভ ও প্রতিহিংসার ছায়াতলে। তখন থেকে কোরবানির ধারা শুরু হয়েছিল। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন বলছে-
‘ওদেরকে আদমের দুই পুত্রের (হাবীল ও ক্বাবীল) ঘটনা ঠিকঠিকভাবে শোনাও; যখন তারা (আল্লাহর উদ্দেশ্যে) একটি করে কোরবানি করেছিল। তাদের একজনের কোরবানি কবুল হল, অন্যজনের হল না। তখন দ্বিতীয়জন (প্রথমজনকে) বলল, ‘আমি তোমাকে খুন করে ফেলব।’ প্রথমজন বলল, ‘আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের কোরবানি কবুল করেন।’ ( আল মায়িদাহ:২৭)।

এরই ধারাবাহিকতায় হযরত ইব্রাহিম আঃ পর্যন্ত পৌঁছে। অনন্তর তিনি মহা পরীক্ষার সম্মুখীন হোন। স্বীয় পুত্র ইসমাইল আঃ কে উৎসর্গ করার দৃঢ় মনোবল ও মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার ঈর্ষণীয় ঈমান নিয়ে আত্মোৎসর্গের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে যান। তার আত্মত্যাগে মহান প্রতিপালক এতোই সন্তুষ্ট হয়ে পড়েন যে, পরবর্তী মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর এই কোরবানির বিধান অত্যাবশ্যক করে দেন। ইব্রাহিম ও ইসমাইল আঃ এর মাঝে ঘটে যাওয়া চমৎকার বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে,
‘অতঃপর যখন সে বাবার সাথে ছুটোছুটি করার বয়সে উপনীত হল তখন (একদিন) ইবরাহীম বলল, ‘বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে জবাই (আল্লাহর নামে কোরবানি) করছি। অতএব ভেবে বল, তোমার মত কি?’ তিনি (ইসমাইল) বললেন, ‘বাবা! তোমাকে যা করতে বলা হচ্ছে তাই কর। আমাকে তুমি ইনশাআল্লাহ ধৈর্যশীল পাবে।’ (আস সফ্ফাত : ১০২)।

এরপর এই ধারাক্রম যথানিয়মে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে এবং উম্মতে মুহাম্মদীর সামর্থবানের জন্য ঈদুল আজহায় কোরবানি করা ওয়াজিব বা আবশ্যক হিসেবে সাব্যস্ত করে দেয়া হয়।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- অতএব, (কৃতজ্ঞতাস্বরূপ) তোমার প্রভুর উদ্দেশ্যে নামায পড় ও কোরবানি কর। (আল কাউছার : ০২)
তেমনিভাবে সহিহ বুখারির ‘কোরবানির বিধান। ইবনে উমর রা. বলেছেনঃ কোরবানি সুন্নত এবং স্বীকৃত প্রথা’ পরিচ্ছেদে এসেছে, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের আগে যবাহ করল সে নিজের জন্যই যবাহ করল। আর যে ব্যাক্তি সালাত আদায়ের পর যবাহ করল। তার কুরবানী পূর্ণ হলো এবং সে মুসলিমদের নীতি অনুসরণ করল। [ হাদিস নং ৫১৪৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন।]
সুতরাং, ঈদুল আযহা কেবল পশু কোরবানি করা এবং আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে আনন্দ প্রমোদকে বুঝায় না বরং ঈদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আত্মোৎসর্গ, নিজের ভেতরে থাকা পশুত্বের মূলতপাটন এবং একমাত্র রবের সন্তুষ্টি। ঈমান আনয়নের মাধ্যমে সবাই মুমিন বা মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ঈমান গ্রহণের সাথে সাথেই প্রতিটি মুমিন ইসলামের সকল বিষয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে। সুখ দুঃখ এবং সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা সর্বাবস্থায় ইসলামই একমাত্র অনুশাসন একথাটি নিজের মধ্যে দৃঢ় করে নেয়া। প্রকৃত মুমিনের মৌলিক চিন্তা চেতনা এমন হওয়াটাই কাম্য।
ঈদ মুসলিম এবং প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার অনন্য মাধ্যম। ইসলাম একটি তাৎপর্যপূর্ণ ধর্ম। এর প্রতিটি আদেশ নিষেধের সাথে জড়িয়ে আছে মুসলিমদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা এবং প্রশান্ত করা । ঈদ মানে আনন্দ ঈদ মানে খুশি একথাটি সবার মুখে রটে বেড়ায় কিন্তু ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা শিক্ষা এবং এর মহত্ত্বের প্রতি কজনই বা গুরুত্ব দিচ্ছি ! ঈদ যেমনি আনন্দের বার্তা দিচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে শিক্ষা দিচ্ছে মহান আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালনের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করার। নিজের মাঝে থাকা পশুত্ব ও অমানবিক মন মানসিকতা বিসর্জন দেওয়ার। বার্তা দিচ্ছে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর। সুপথ দেখাচ্ছে ন্যায় নীতি আর নিষ্ঠার পথে চলার। শিক্ষা দিচ্ছে সুন্দর ও পবিত্র মনের অধিকারী হওয়ার। তাই আসুন ঈদুল আযহার প্রকৃত মহত্ত্ব ও তাৎপর্য নিজে লালন করতে শিখি। অসুন্দর ও কলুষিত হৃদয় পবিত্র করার লক্ষ্যে ঈদুল আজহায় শিক্ষা গ্রহণ করি। করোনার এই দুর্যোগ ও মহামারীতে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করি। অন্য সময় দান সদাকাহ এবং সহযোগিতার পরিমাণ যেটুকু ছিল এখন সেটা আরো বাড়াতে চেষ্টা করি। সবিশেষ সকলের প্রতি সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই।

শিক্ষার্থী, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়
কায়রো, মিশর।
সাবেক শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *