Thu. Jul 9th, 2020

Onesylhet24.com

Online News Paper

দুর্নীতির দায়ে স্থায়ী ভাবে বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ আবার পুনর্বহাল, এলাকায় উত্তেজনা

সিলেট সদর উপজেলার সাহেবের বাজার হাই স্কুল এন্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ দেবেন্দ্র কুমার সিংহ দুর্নীতির দায়ে স্থায়ী ভাবে বরখাস্ত হয়ে ফের ‘নিয়মবহির্ভূতভাবে’ স্বপদে বহাল হলেন।

কলেজের বর্তমান গভর্নিং বডির কতিপয় নেতৃবৃন্দকে ‘ম্যানেজ’ করে তিনি স্বপদে বহাল হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে এলাকায় দেখা দিয়েছে দ্বন্দ্বের, সৃষ্টি হয়েছে দুই গ্রুপ। যে কোনো সময় ঘটতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা।

জানা যায়, দেবেন্দ্র কুমার সিংহের ক্ষমতার দাপট ও অনিয়ম বেপরোয়া জীবন যাপন কলেজ কতৃপক্ষের নজরে আসে। তারপর পরিচালনা পরিষদ তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, তদন্তে একের পর এক বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘটনাটির জন্য গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির রির্পোট এ উঠে আসে কয়েক লক্ষ টাকার আর্থিক লেনদেনের গড়মিল, সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ। পরে বেশ কয়েকটি সভা করে দেবেন্দ্র কুমার সিংহ থাকাকালীন সময়ে তার বিরুদ্ধে ৮ টি অভিযোগের কথা উল্লেখ করে যথা ক্রমে প্রথম নোটিশ ২৬/০১/১৮ ইং, দ্বিতীয় নোটিশ ১৮/০৪/১৮ ইং ও তৃতীয় নোটিশ ০৩/১০/১৮ ইং তারিখে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়। পরে কলেজ কর্তৃপক্ষের পাঠানো নোটিশ দেবেন্দ্র কুমার সিংহ হাতে পেয়ে

ভিন্ন ভিন্ন তারিখে জবাব দেন তিনি। কর্তৃপক্ষের নিকট দেবেন্দ্র কুমার সিংহের পাঠানো নেটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাকে দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৭ তারিখের ৬নং সভায় কলেজর গভর্নিং বডির চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

তখন তার বিরুদ্ধে ৮টি আনিত অভিযোগ তদন্ত করতে গঠন করা হয় একটি তদন্ত কমিটি। এসময় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরিন অডিট রির্পোটে উঠে আসে অসংখ্য অনিয়মের বিষয়। কলেজ কতৃপক্ষ তদন্ত করে দেখা যায় – ২০১৬ হতে ২০১৮ বর্ষে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও সনদপত্র সংক্রান্ত ২ লাখ ৪৯ হাজার টাকার কোনো হিসাব নেই। এছাড়াও গভর্নিং বডিকে না জানিয়ে তিনি প্রায় সাত লক্ষ টাকা বেতন মওকুফ হিসেবে দেখিয়েছেন। যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ও অনিয়ম। পাওয়া যায় সর্বমোট ১৫ লক্ষ ২০ হাজার ৮ শত ৭৫ টাকার আর্থিক লেনদেনে বিশাল গড়মিল।

এদিকে, অধ্যক্ষ দেবেন্দ্র কুমার সিংহের বিরুদ্ধে আনিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশে একটি তদন্তকমিটি গঠিত হয়। এই কমিটিতে ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার্ড আ.ফ.ম মিফতাহুল হক মাসুদ, আম্বরখানা স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ মুহাদ্দিস আহমদ ও কালারুকা মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আহমদ আলী। তদন্ত শেষে তারা প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন সাবেক কমিটির কাছে। সেখানেও উঠে আসে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র পাওয়া যায় প্রায় ১২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকার বিশাল গড়মিল। চুড়ান্ত রিপোর্টে দেবেন্দ্র কুমার সিংহের বিরুদ্ধে বিশাল দুর্নীতির প্রমান পাওয়ার পরেও কিভাবে তিনি আবারও স্বপদে বহাল হলেন এনিয়ে এলাকায় রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

দেবেন্দ্র কুমার সিংহের বিরুদ্ধে ৮টি আনিত অভিযোগ আনা হয় সেগুলো হলো ১। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা, ২। প্রতিষ্ঠানের গভার্ণিং বডির সদস্যদের সাথে অসধ আচরন। ৩। প্রতিষ্ঠানের শৃংখলা বিরোধী কর্মকান্ড, ৪। প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কর্মকান্ড সহ ৮ অভিযোগ সন্দেহাতিত ভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী আইনে তাকে চুড়ান্ত তদন্ত কমিটি স্থায়ী বরখাস্তের সুপারিশ করেন। তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কলেজ কর্তৃপক্ষ মিটিং করে রেজুলেশন সহ সাবেক কমিটি বিষয়টি অনুমোদনের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এর সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রেরণ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে নতুন কমিটির গভার্ণিং বডি নিয়ম নিতির তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানের আত্মসাৎকৃত অর্থ আদায় না করে, এমনকি তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ যাচাই বাছাই না করে তাকে স্বপদে বহাল করা হয়। মূলত এসব অভিযোগের ভিত্তিতে অধ্যক্ষ দেবেন্দ্র কুমার তার পদটি হারান। তার অবর্তমানে প্রায় দুই বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন সহকারী শিক্ষক হারুন অর রশীদ। পরে গত ৪/২/২০২০ ইং তারিখে দেবেন্দ্র কুমার বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে ‘ম্যানেজ’ করে অধ্যক্ষ পদে বহাল হয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় দেখা দিয়েছে দ্বন্দ্বের, সৃষ্টি হয়েছে দুই গ্রুপ।

এ বিষয়ে শাবিপ্রবির ডেপুটি রেজিস্ট্রার্ড মিফতাহুল হক মাসুদ এ প্রতিবেদককে বলেন, অধ্যক্ষ দেবেন্দ্র যে কাজ করেছেন তা এক কথায় অনিয়ম। তার বিরুদ্ধে উঠা সকল অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ মর্মে তদন্ত কমিটি চূড়ান্ত একটি প্রতিবেদন তৎক্ষালীন সভাপতির কাছে জমা দিয়েছি।

এ প্রসঙ্গে আম্বরখানা স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ মুহাদ্দিস আহমদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন আমরা জমা দিয়েছি। সেখানেই সব লেখা আছে।

বিষয়টি নিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আব্দুল আলিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, অধ্যক্ষ দেবেন্দ্র পুনরায় ফিরে আসার বিষয়ে আগে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। ফিরে আসার পর বর্তমান সভাপতির কাছে জানতে চাইলে তিনি আমাকে বলেন, ‘আমার জানামতে সবার সম্মতিক্রমে অধ্যক্ষকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

অভিযুক্ত অধ্যক্ষ দেবেন্দ্র কুমার সিংহ এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি বহিস্কার হইনি। সাবেক কমিটি আমাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে দিয়েছিলো। পরে সাবেক ও বর্তমান কমিটির নেতৃবৃন্দ একটি ‘সমঝোতা’র ভিত্তিতে আমাকে আবার অধ্যক্ষ পদে বহাল করেছেন শিক্ষাবোর্ডের লিখিত অনুমতিপত্র ছাড়া কীভাবে বহাল হলেন এমন প্রশ্নের বিষয়ে কোনো সদুত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, আসলে এটা মৌখিকভাবে বলাতেই আমি আবার ফিরে এসেছি।

সিলেট শিক্ষাবোর্ড অফিসের সচিব মোস্তফা কামাল আহমদ এ বিষয়ে বলেন, আমার জানামতে- এ কলেজের সাবেক ও বর্তমান কমিটি একসঙ্গে একটি বৈঠকে বসে ‘সমঝোতার’ মাধ্যমে দেবেন্দ্রকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

এ বিষয়ে সাহেবের বাজার হাই স্কুল এন্ড কলেজের গভর্নিং বডির সাবেক একাধিক বারের সভাপতি ও সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আশফাক আহমদ জানান, আমরা জানি না উনি কীভাবে স্বপদে বহাল হলেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এবং তদন্তে তা প্রমাণিতও হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি সহ অবৈধভাবে কলেজের সকল কাগজপত্র তার বাড়ীতে রাখা সহ ৮টি অভিযোগ আনা হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ অনিয়মের বিষয়টি শিক্ষা বোর্ডকে জানিয়ে তার বিরুদ্ধে কলেজ কর্তৃপক্ষের সভার প্রাপ্ত আদেশ সহ সকল তদন্ত প্রতিবেদন উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড সিলেট এর বরাবরে পাঠানো হয়েছে। এখন যদি বর্তমান কমিটির শীর্ষ কয়েকজন চুপিসারে উনাকে আবার অধ্যক্ষ পদে বহাল রাখেন তবে তো অন্য যে কেউ দুর্নীতি করতে সাহস পাবে। তিনি আরও বলেন, উনাকে যদি আনতেই হয় তবে নিয়ম-নীতির ভিতর দিয়েই আনতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে বর্তমান কমিটির সভাপতি আফছর উদ্দীনের মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি খুব উত্তেজিতভাবে বলেন, এ বিষয়ে আপনার জানার দরকার কী? এ বিষয়ে আপনাকে কিছু বলা যাবে না।